Dhaka 9:34 pm, Tuesday, 23 June 2026

ত্রিমুখী লড়াইয়ে পাল্টে যাওয়া সমীকরণ গাজীপুর-৩,স্বতন্ত্র প্রার্থী ইজাদুর রহমান মিলনের দিকে ঝুঁকছে মাঠের হিসাব

  • Reporter Name
  • Update Time : 12:19:41 pm, Wednesday, 11 February 2026
  • 82 Time View

সোহাগ রানা, গাজীপুর জেলা প্রতিনিধি

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এরই মধ্যে গাজীপুর–৩ (শ্রীপুর উপজেলা ও গাজীপুর সদর উপজেলার আংশিক) আসনটি জাতীয় রাজনীতির পাশাপাশি স্থানীয় রাজনীতিতেও আলোচনার কেন্দ্রেবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
এই আসনটিতে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী  ডা.অধ্যাপক এস এম রফিকুল ইসলাম বাচ্চু ধানের শীষ প্রতীকে, জামায়াতে ইসলামী এর নেতৃত্বাধীন ১১দলীয় ঐক্যজোটের প্রার্থী এহসানুল হক রিক্সা প্রতীকে এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ঘোড়া প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ইজাদুর রহমান মিলন।
নির্বাচনের প্রাক্কালে গাজীপুর-৩ আসনে চিত্র ছিল ভিন্ন। জামায়াতে ইসলামীর মনোনীত প্রার্থী হিসেবে মাঠে ছিলেন সংগঠনের মজলিশে সুরার অন্যতম সদস্য ও গাজীপুর জেলা জামায়াতের আমীর ডঃ. মোঃ জাহাঙ্গীর আলম। জনপ্রিয়তা,সাংগঠনিক দক্ষতা এবং জোরালো প্রচারণার কারণে তাকে তখন এই আসনের সবচেয়ে শক্তিশালী ও সম্ভাব্য বিজয়ী প্রার্থী হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিলো। তার ক্রমবর্ধমান জনসমর্থন বিএনপি শিবিরে স্পষ্ট অস্বস্তি ও হতাশার জন্ম দিয়েছিলো। কিন্তু ১১দলীয় ঐক্যজোটের সাংগঠনিক সমন্বয়ের অংশ হিসেবে শেষ পর্যন্ত গাজীপুর-৩ আসনটি খেলাফতে মজলিশকে ছেড়ে দেওয়া হয়। দলীয় ও জোটগত সিদ্ধান্তের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে ডঃ জাহাঙ্গীর আলম প্রার্থিতা প্রত্যাহার করলে নির্বাচনী সমীকরণ হঠাৎ করেই নতুন মোড় নেয়। এতে বিএনপি শিবির কিছুটা স্বস্তি পেলেও মাঠ পুরোপুরি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে পারেনি।
এই শূন্যতার সুযোগেই দৃশ্যপটে ক্রমশ সামনে আসতে শুরু করেন স্বতন্ত্র প্রার্থী ইজাদুর রহমান মিলন। স্থানীয় রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত মুখ মিলন এর আগেও বৃহত্তর মির্জাপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে টানা ১১ বছর দায়িত্ব পালন করেছেন। পাশাপাশি গাজীপুর সদর উপজেলা পরিষদের নির্বাচিত চেয়ারম্যান হিসেবে ২ (দুই) মেয়াদে তার ৭ বছরের অভিজ্ঞতা রয়েছে। জনপ্রতিনিধি হিসেবে দীর্ঘ এই সময়জুড়ে জনসেবা, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং রাজনৈতিক সমীকরণ বোঝার বাস্তব অভিজ্ঞতা তাকে অন্য প্রার্থীদের তুলনায় আলাদা উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
ইজাদুর রহমান মিলনের পরিচয় শুধু একজন রাজনীতিক হিসেবেই সীমাবদ্ধ নয়। তিনি ভবানীপুর মুক্তিযোদ্ধা কলেজের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ হিসেবে শিক্ষাক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, চাঁদাবাজ ও দলবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান,নিজ এলাকার মানুষের প্রতি নিরবচ্ছিন্ন সেবা এবং মসজিদ, মাদ্রাসা, মন্দির,স্কুল ও কলেজে তার স্বতঃস্ফূর্ত অনুদান ও অংশগ্রহণ তাকে এলাকায় ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা এনে দিয়েছে।
অন্যদিকে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যজোটের প্রার্থী এহসানুল হক শেষ সময়ে এসে পুরো নির্বাচনী এলাকা কার্যকরভাবে প্রদক্ষিণ করতে পারেননি। গাজীপুর সদর উপজেলার বেশ কিছু এলাকায় এখনো তার দৃশ্যমান গণসংযোগ চোখে পড়েনি। বিশেষ করে মির্জাপুর, পিরুজালী ও ভাওয়াল গড় ইউনিয়নে রিক্সা প্রতীকের প্রচারণা প্রায় অনুপস্থিত। এমনকি এসব এলাকায় জোট প্রার্থীর পক্ষে সক্রিয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির অস্তিত্ব নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয় পর্যায়ে শোনা যাচ্ছে, জামায়াতে ইসলামীর অনেক দায়িত্বশীল সমর্থক ইতিমধ্যে নীরবে ও অনানুষ্ঠানিকভাবে ইজাদুর রহমান মিলনের প্রতি সমর্থন জানাচ্ছেন।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা হলো,
আওয়ামীলীগ এবার নির্বাচনে অংশ না নিলেও ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক নিরাপত্তা ও পরিস্থিতির কথা বিবেচনায় রেখে দলটির ঐতিহ্যবাহী ভোটব্যাংক কার্যত স্বতন্ত্র প্রার্থী মিলনের দিকেই ঝুঁকছে বলে বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে। এই সমর্থন নির্বাচনী অঙ্কে একটি বড় ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করতে পারে।
বিএনপি প্রার্থী ডা. এস এম রফিকুল ইসলাম বাচ্চুর ধানের শীষের প্রচারণা নিঃসন্দেহে জোরালো। তবে পতিত আওয়ামী লীগের বহু চিহ্নিত ও বিতর্কিত নেতাকে দলে অন্তর্ভুক্ত করায় বিএনপির বিরুদ্ধে আদর্শচ্যুতির অভিযোগ উঠেছে। আওয়ামী সরকারের পতনের পর গত ১৭মাসে শ্রীপুর ও গাজীপুর সদর উপজেলায় বিএনপির বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ জনমনে প্রশ্ন তৈরি করেছে। ৫ই আগস্টের পর এই দলের প্রতি মানুষের যে প্রবল আস্থা ছিলো তা ক্রমবর্ধমান হারে হ্রাস পেয়েছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।
জাতীয় পর্যায়ে বিএনপি ও জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১দলীয় ঐক্যজোটের মধ্যকার সাংবিধানিক ভোটযুদ্ধের ফল যেমন ১২ ফেব্রুয়ারি নির্ধারিত হবে,তেমনি গাজীপুর-৩ আসনেও ভোটাররা সিদ্ধান্ত নেবেন-দলীয় প্রতীকের রাজনীতি,না কি পরীক্ষিত জনপ্রতিনিধিত্ব ও স্থানীয় উন্নয়নের বাস্তব অভিজ্ঞতা।
সব মিলিয়ে মাঠের বর্তমান পরিস্থিতি,নীরব সমর্থনের প্রবাহ,দীর্ঘদিনের জনসেবার রেকর্ড এবং বহুমাত্রিক গ্রহণযোগ্যতা বিবেচনায় গাজীপুর-৩ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী ইজাদুর রহমান মিলন ক্রমেই একজন শক্তিশালী ও সম্ভাব্য বিজয়ী প্রার্থী হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছেন। এমনটিই ধারণা করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Hello world!

ত্রিমুখী লড়াইয়ে পাল্টে যাওয়া সমীকরণ গাজীপুর-৩,স্বতন্ত্র প্রার্থী ইজাদুর রহমান মিলনের দিকে ঝুঁকছে মাঠের হিসাব

Update Time : 12:19:41 pm, Wednesday, 11 February 2026

সোহাগ রানা, গাজীপুর জেলা প্রতিনিধি

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এরই মধ্যে গাজীপুর–৩ (শ্রীপুর উপজেলা ও গাজীপুর সদর উপজেলার আংশিক) আসনটি জাতীয় রাজনীতির পাশাপাশি স্থানীয় রাজনীতিতেও আলোচনার কেন্দ্রেবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
এই আসনটিতে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী  ডা.অধ্যাপক এস এম রফিকুল ইসলাম বাচ্চু ধানের শীষ প্রতীকে, জামায়াতে ইসলামী এর নেতৃত্বাধীন ১১দলীয় ঐক্যজোটের প্রার্থী এহসানুল হক রিক্সা প্রতীকে এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ঘোড়া প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ইজাদুর রহমান মিলন।
নির্বাচনের প্রাক্কালে গাজীপুর-৩ আসনে চিত্র ছিল ভিন্ন। জামায়াতে ইসলামীর মনোনীত প্রার্থী হিসেবে মাঠে ছিলেন সংগঠনের মজলিশে সুরার অন্যতম সদস্য ও গাজীপুর জেলা জামায়াতের আমীর ডঃ. মোঃ জাহাঙ্গীর আলম। জনপ্রিয়তা,সাংগঠনিক দক্ষতা এবং জোরালো প্রচারণার কারণে তাকে তখন এই আসনের সবচেয়ে শক্তিশালী ও সম্ভাব্য বিজয়ী প্রার্থী হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিলো। তার ক্রমবর্ধমান জনসমর্থন বিএনপি শিবিরে স্পষ্ট অস্বস্তি ও হতাশার জন্ম দিয়েছিলো। কিন্তু ১১দলীয় ঐক্যজোটের সাংগঠনিক সমন্বয়ের অংশ হিসেবে শেষ পর্যন্ত গাজীপুর-৩ আসনটি খেলাফতে মজলিশকে ছেড়ে দেওয়া হয়। দলীয় ও জোটগত সিদ্ধান্তের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে ডঃ জাহাঙ্গীর আলম প্রার্থিতা প্রত্যাহার করলে নির্বাচনী সমীকরণ হঠাৎ করেই নতুন মোড় নেয়। এতে বিএনপি শিবির কিছুটা স্বস্তি পেলেও মাঠ পুরোপুরি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে পারেনি।
এই শূন্যতার সুযোগেই দৃশ্যপটে ক্রমশ সামনে আসতে শুরু করেন স্বতন্ত্র প্রার্থী ইজাদুর রহমান মিলন। স্থানীয় রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত মুখ মিলন এর আগেও বৃহত্তর মির্জাপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে টানা ১১ বছর দায়িত্ব পালন করেছেন। পাশাপাশি গাজীপুর সদর উপজেলা পরিষদের নির্বাচিত চেয়ারম্যান হিসেবে ২ (দুই) মেয়াদে তার ৭ বছরের অভিজ্ঞতা রয়েছে। জনপ্রতিনিধি হিসেবে দীর্ঘ এই সময়জুড়ে জনসেবা, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং রাজনৈতিক সমীকরণ বোঝার বাস্তব অভিজ্ঞতা তাকে অন্য প্রার্থীদের তুলনায় আলাদা উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
ইজাদুর রহমান মিলনের পরিচয় শুধু একজন রাজনীতিক হিসেবেই সীমাবদ্ধ নয়। তিনি ভবানীপুর মুক্তিযোদ্ধা কলেজের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ হিসেবে শিক্ষাক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, চাঁদাবাজ ও দলবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান,নিজ এলাকার মানুষের প্রতি নিরবচ্ছিন্ন সেবা এবং মসজিদ, মাদ্রাসা, মন্দির,স্কুল ও কলেজে তার স্বতঃস্ফূর্ত অনুদান ও অংশগ্রহণ তাকে এলাকায় ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা এনে দিয়েছে।
অন্যদিকে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যজোটের প্রার্থী এহসানুল হক শেষ সময়ে এসে পুরো নির্বাচনী এলাকা কার্যকরভাবে প্রদক্ষিণ করতে পারেননি। গাজীপুর সদর উপজেলার বেশ কিছু এলাকায় এখনো তার দৃশ্যমান গণসংযোগ চোখে পড়েনি। বিশেষ করে মির্জাপুর, পিরুজালী ও ভাওয়াল গড় ইউনিয়নে রিক্সা প্রতীকের প্রচারণা প্রায় অনুপস্থিত। এমনকি এসব এলাকায় জোট প্রার্থীর পক্ষে সক্রিয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির অস্তিত্ব নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয় পর্যায়ে শোনা যাচ্ছে, জামায়াতে ইসলামীর অনেক দায়িত্বশীল সমর্থক ইতিমধ্যে নীরবে ও অনানুষ্ঠানিকভাবে ইজাদুর রহমান মিলনের প্রতি সমর্থন জানাচ্ছেন।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা হলো,
আওয়ামীলীগ এবার নির্বাচনে অংশ না নিলেও ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক নিরাপত্তা ও পরিস্থিতির কথা বিবেচনায় রেখে দলটির ঐতিহ্যবাহী ভোটব্যাংক কার্যত স্বতন্ত্র প্রার্থী মিলনের দিকেই ঝুঁকছে বলে বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে। এই সমর্থন নির্বাচনী অঙ্কে একটি বড় ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করতে পারে।
বিএনপি প্রার্থী ডা. এস এম রফিকুল ইসলাম বাচ্চুর ধানের শীষের প্রচারণা নিঃসন্দেহে জোরালো। তবে পতিত আওয়ামী লীগের বহু চিহ্নিত ও বিতর্কিত নেতাকে দলে অন্তর্ভুক্ত করায় বিএনপির বিরুদ্ধে আদর্শচ্যুতির অভিযোগ উঠেছে। আওয়ামী সরকারের পতনের পর গত ১৭মাসে শ্রীপুর ও গাজীপুর সদর উপজেলায় বিএনপির বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ জনমনে প্রশ্ন তৈরি করেছে। ৫ই আগস্টের পর এই দলের প্রতি মানুষের যে প্রবল আস্থা ছিলো তা ক্রমবর্ধমান হারে হ্রাস পেয়েছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।
জাতীয় পর্যায়ে বিএনপি ও জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১দলীয় ঐক্যজোটের মধ্যকার সাংবিধানিক ভোটযুদ্ধের ফল যেমন ১২ ফেব্রুয়ারি নির্ধারিত হবে,তেমনি গাজীপুর-৩ আসনেও ভোটাররা সিদ্ধান্ত নেবেন-দলীয় প্রতীকের রাজনীতি,না কি পরীক্ষিত জনপ্রতিনিধিত্ব ও স্থানীয় উন্নয়নের বাস্তব অভিজ্ঞতা।
সব মিলিয়ে মাঠের বর্তমান পরিস্থিতি,নীরব সমর্থনের প্রবাহ,দীর্ঘদিনের জনসেবার রেকর্ড এবং বহুমাত্রিক গ্রহণযোগ্যতা বিবেচনায় গাজীপুর-৩ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী ইজাদুর রহমান মিলন ক্রমেই একজন শক্তিশালী ও সম্ভাব্য বিজয়ী প্রার্থী হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছেন। এমনটিই ধারণা করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।